হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার (১৪ অক্টোবর) কোমের মসজিদে আজমে আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলির সাপ্তাহিক নৈতিক শিক্ষার আসর অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
হযরত জয়নাবে কুবরা (সা. আ.)-এর পবিত্র জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে তিনি আহলে বাইতের (আ.) জ্ঞানগত মর্যাদা, ভাগ্যবাদী চিন্তাধারার অসারতা, মানুষের কর্মের দায়বদ্ধতা এবং আত্মিক উৎকর্ষের বিষয়ে আলোচনা করেন। বিশেষ করে, উবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদের সামনে হযরত জয়নাবের (সা. আ.) বক্তব্যের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন তিনি।
ভাগ্যবাদের বিরুদ্ধে হযরত জয়নাবের (সা. আ.) জ্ঞানভিত্তিক অবস্থান
আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলি বলেন, কুফায় হযরত জয়নাবে কুবরার (সা. আ.) বক্তব্য কেবল শোক ও বেদনার প্রকাশ ছিল না; বরং তা ছিল বিশ্বাস ও ধর্মতত্ত্বের একটি সূক্ষ্ম বিষয়ে গভীর জ্ঞানভিত্তিক বক্তব্য।
উমাইয়া শাসনামলে ভাগ্যবাদী চিন্তাধারার প্রচলন সম্পর্কে তিনি বলেন, মুয়াবিয়া দীর্ঘ শাসনকালে নিজের ক্ষমতা সুসংহত ও শাসন টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। সরকারের সাফল্য ও কল্যাণকে নিজেদের কৃতিত্ব হিসেবে তুলে ধরা এবং অন্যায়-অবিচার ও সমস্যার দায় আল্লাহর ওপর চাপানোর উদ্দেশ্যে তারা ভাগ্যবাদী চিন্তাধারা প্রচার করতেন।
তিনি বলেন, উমাইয়া শাসকদের পর আব্বাসীয় শাসকসহ অন্য শাসকরাও নিজেদের অন্যায়-অবিচারকে বৈধতা দিতে এবং ক্ষমতা ধরে রাখতে বিভিন্ন ঘটনাকে আল্লাহর তাকদিরের ফল হিসেবে উপস্থাপন করতেন। এর মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের কর্মকাণ্ডের দায় এড়াতে চাইতেন। বিপরীতে, আহলে বাইত (আ.) ‘না জবর, না সম্পূর্ণ ক্ষমতা অর্পণ; বরং এ দুয়ের মধ্যবর্তী একটি অবস্থান’—এই মূলনীতি তুলে ধরে মানুষকে তার কাজ ও আচরণের জন্য দায়বদ্ধ বলে শিক্ষা দিয়েছেন।
আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলি আরও বলেন, আহলে বাইতের ইমামগণ (আ.) গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী ছিলেন। তাঁরা সূক্ষ্ম ইলমি ও যুক্তিভিত্তিক বিষয় ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি চিন্তা ও বিশ্বাসের বিচ্যুতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি হযরত জয়নাবে কুবরার (সা. আ.) সঙ্গে উবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদের কথোপকথনের উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, উবাইদুল্লাহ যখন হযরত জয়নাবকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘দেখলে, আল্লাহ তোমার ভাইয়ের সঙ্গে কী করেছেন?’ কিংবা বলেছিল, ‘আলী ইবনে হুসাইনকে আল্লাহই কারবালায় হত্যা করেছেন!’—তখন সে হত্যাকাণ্ডের দায় নিজেদের ওপর থেকে সরিয়ে আল্লাহর সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছিল।
এর জবাবে হযরত জয়নাব (সা. আ.) বলেছিলেন, ‘মা রাআইতু ইল্লা জামিলা’—‘সুন্দর ছাড়া আর কিছুই দেখিনি।’
আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলির ব্যাখ্যায়, হযরত জয়নাবের এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আল্লাহর কাজের সৌন্দর্য স্বীকার করার পাশাপাশি হত্যাকারীদের দায়ও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আলী ইবনে হুসাইনকে শহীদ করেছে হত্যাকারীরাই, আল্লাহ নন। এভাবেই হযরত জয়নাব উমাইয়াদের ভাগ্যবাদী চিন্তাধারাকে খণ্ডন করে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও কর্মের দায়বদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।
নিজেকে জান্নাতের চেয়ে কম মূল্যে বিক্রি করবেন না
নাহজুল বালাগার একটি বাণী ব্যাখ্যা করে আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলি মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা, অস্তিত্বের মূল্য এবং পার্থিব মোহ থেকে মুক্ত থাকার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.) বলেছেন,
أَلَا حُرٌّ یَدَعُ هَذِهِ اللُّمَاظَةَ لِأَهْلِهَا، إِنَّهُ لَیْسَ لِأَنْفُسِکُمْ ثَمَنٌ إِلَّا الْجَنَّةَ، فَلَا تَبِیعُوهَا إِلَّا بِهَا.
অর্থ: ‘এমন কোনো স্বাধীনচেতা মানুষ কি নেই, যে এই উচ্ছিষ্ট তার উপযুক্ত লোকদের জন্য ছেড়ে দেবে? জেনে রাখো, জান্নাত ছাড়া তোমাদের সত্তার আর কোনো মূল্য নেই। সুতরাং জান্নাত ছাড়া অন্য কিছুর বিনিময়ে নিজেদের বিক্রি করো না।’
‘লুমাজা’ শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা খাবারের অবশিষ্টাংশকে লুমাজা বলা হয়। তাঁর মতে, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, রাজনীতি ও সমাজের বিভিন্ন পদমর্যাদা ও অবস্থানও অনেকটা এমন উচ্ছিষ্টের মতো। অন্যরা এসব অবস্থানে আসেন, সেখান থেকে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন, তারপর চলে যান। প্রকৃত স্বাধীনচেতা মানুষ এসব পদ-পদবির মোহে আচ্ছন্ন না হয়ে নিজের অস্তিত্বের প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করেন।
তিনি বলেন, মানুষের প্রকৃত মূল্য জান্নাত; তাই নিজেকে জান্নাতের চেয়ে কম মূল্যে বিক্রি করা উচিত নয়। মানুষ যখন তুচ্ছ পার্থিব প্রাপ্তির মোহ ত্যাগ করে জান্নাতকে নিজের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে, তখন তার চিন্তা ও কর্মও কল্যাণমুখী হয়। সে নিজের পাশাপাশি অন্যের কল্যাণ কামনা করে এবং কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করা কিংবা নিজেকে কল্যাণ থেকে বঞ্চিত করার পথ বেছে নেয় না।
নিজের হৃদয়কে জানুন, আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করুন
আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর ‘الْقَلْبُ مُصْحَفُ الْبَصَر’—‘হৃদয় দৃষ্টির গ্রন্থ’—বাণী উদ্ধৃত করে আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমুলি আত্মোপলব্ধির গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, মানুষকে নিজের হৃদয়ের অবস্থা বুঝতে হবে—তার অন্তর কী চায় এবং কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে, তা উপলব্ধি করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে তিনি একটি কবিতার পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করেন, যার মর্মার্থ হলো—হৃদয় এক মুহূর্তের জন্যও অসতর্ক থাকলে বিপদের তির এসে তাকে বিদ্ধ করতে পারে।
আল্লাহর স্মরণ ও তাঁর সঙ্গে মোনাজাতের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, মানুষের হৃদয় তার প্রতিপালকের সঙ্গে মোনাজাত করার সক্ষমতা রাখে। আল্লাহর স্মরণ ও তাঁর নামের মাধ্যমে মানুষ আধ্যাত্মিক দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। পার্থিব মোহ ও তুচ্ছ আকর্ষণ ত্যাগ করলে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথ সহজ হয়। মানুষ এ পথে যত এগিয়ে যায়, আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক তত গভীর হয়। একপর্যায়ে ‘ইয়া আল্লাহ’—‘হে আল্লাহ’ বলার পরিবর্তে সে শুধু ‘আল্লাহ’ বলে সম্বোধন করে।
মানুষের প্রকৃত সত্তা নারী-পুরুষ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে
বক্তব্যের শেষাংশে মানুষের আত্মার প্রকৃতি ও সৃষ্টিজগতে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করে আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলি বলেন, ইসলামের দৃষ্টিতে নারী বা পুরুষ হওয়া মানুষের দৈহিক সত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত; আত্মা নিজে পুরুষও নয়, নারীও নয়।
পবিত্র কোরআনে মুমিন ও সৎকর্মশীল মানুষের গুণাবলি সম্পর্কিত আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, দেহ হলো আত্মার উন্নতির সিঁড়ি; দৈহিক বৈশিষ্ট্য আত্মার প্রকৃত সত্তা নির্ধারণ করে না। আত্মা পূর্ণতা ও বিমূর্ততার পথে অগ্রসর হয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের প্রকৃত সত্তা নারী-পুরুষ পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রত্যেক মানুষই আত্মিক উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে উচ্চতর আধ্যাত্মিক মর্যাদায় পৌঁছাতে পারে।
পরিশেষে আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলি উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ এবং জ্ঞানচর্চা ও আত্মোন্নয়নের পথে নিয়োজিত সবার জন্য দোয়া করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সবাই যেন হযরত জয়নাবে কুবরার (সা. আ.) দোয়ার বরকত লাভ করেন এবং আহলে বাইতের (আ.) অনুগ্রহে ইসলামি ব্যবস্থা সব বিপদ থেকে সুরক্ষিত থাকে ও হযরত ইমাম মাহদীর (আ.ফা.) কাছে সমর্পিত হয়।
আপনার কমেন্ট